বৃহস্পতিবার, ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ০৭:০২ পূর্বাহ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক:-
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের রাজশাহী আঞ্চলিক কার্যালয়ের কলেজ শাখার সহকারী পরিচালক (এডি) মো. আলমাছ উদ্দিন অনিয়ম আর ঘুষ বাণিজ্যের কারণে ‘দুর্নীতির বরপুত্র’ খ্যাতি পেয়েছেন। নিয়ম ভেঙ্গে ও ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে রাজশাহী অঞ্চলের বিভিন্ন কলেজের শিক্ষকদের এমপিও করে দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগের তদন্তও চলছে। এই আলমাছ রাজশাহী নগরীতে কিনেছেন কয়েক কোটি টাকার দুটি ফ্ল্যাট। ‘দুর্নীতিবাজ’ আলমাছ তার পাশের ফ্ল্যাটের রান্নাঘরে ঘুষের চার ব্যাগ টাকা রাখা নিয়েও ঘটিয়েছেন তুঘলকি কাণ্ড। তবে ৫ আগস্টের পর নতুন পরিচালক অধ্যাপক মোহা. আছাদুজ্জামানকেও তার অপকর্মের সঙ্গী বানিয়েছেন আলমাছ। ফলে মিলেমিলে বাণিজ্যে নেমেছেন পরিচালক ও সহকারী পরিচালক। এমন কী পরিচালক বাসা ভাড়া না নিয়ে অফিসের গেস্টরুমকেই বাসা বানিয়ে শিক্ষা ভবনেই আস্তানা গেঁড়েছেন। তারা রাজশাহী অঞ্চলের ডিগ্রী স্তরের তৃতীয় শিক্ষকের বিশেষ এমপিওভুক্তিতে করেছেন ভয়াবহ জালিয়াতি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত বছরের ১৭ নভেম্বর মাউশি রাজশাহীর আঞ্চলিক কার্যালয়ের কলেজ শাখার পরিচালক হিসেবে যোগদানের যোগদানের পর থেকেই সপ্তাহের প্রায় ৪ দিন থাকেন নিজ এলাকা পাবনায়। ফলে রাত্রীযাপনের জন্য রাজশাহীতে আলাদা কোনো বাসা নেননি তিনি। সপ্তাহের বাকি তিন দিন রাতের বেলা মাউশি কার্যালয়ের গেস্ট রুমের একটি কক্ষেই থাকেন তিনি। পরিচালকের বাড়ি এবং তার গাড়ির ড্রাইভার সাইদুল, পিয়ন জাহাঙ্গীর ও রানার বাড়ি পাবনায় হওয়ার সুবাদে এই তিনি এই তিন কর্মচারির মাধ্যমে তার দুর্নীতি ও আর্থিক লেনদেন করেন। আর ‘দুর্নীতির বুরপুত্র’ খ্যাত এডি (কলেজ) আলমাছের সাথে আতাত করে পরিচালক পুরো মাউশি দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য বানিয়েছেন।
তার দপ্তরের এক কর্মচারি বলেন, ‘স্যারের (পরিচালক) স্ত্রী নিজ এলাকা পাবনায় চাকরি করেন। পরিবার নেই তাই স্যার অফিসের একটি কক্ষেই আপাতত থাকেন। হয়তো কিছুদিনের মধ্যেই বাসা ভাড়া নিবেন।’
তৃতীয় শিক্ষকদের এমপিওতে ভয়াবহ জালিয়াতি : ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ডিগ্রী স্তরে গভর্নিং বডি কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত তৃতীয় শিক্ষকদের বিশেষ এমপিওভুক্ত করতে গত বছরের ১৫ জুলাই মাউশি রাজশাহী অঞ্চলের তৎকালীন পরিচালক (কলেজ) অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ ব্যানার্জী ১০৩ জন শিক্ষকের একটি তালিকা মাউশি অধিদপ্তর, ঢাকার মহাপরিচালক বরাবর পাঠান।
এরপর শিক্ষা মন্ত্রণালয় চাহিদা অনুযায়ী এমপিওভূক্ত তৃতীয় শিক্ষকদের নাম, পদবি, বিষয়, প্রতিষ্ঠানের নাম ও শিক্ষার্থীর সংখ্যাসহ মাউশি রাজশাহী অঞ্চলের পরিচালক অধ্যাপক আছাদুজ্জামান গত বছরের ২ ডিসেম্বর ২০৭ জনের তথ্য পাঠান। এই ২০৭ জনের মধ্যে ৪২ জনের এমপিও আগে থেকেই ছিল। যোগ্য তালিকার ১০৩ জনের মধ্য থেকেই এমপিওভূক্ত হওয়ার কথা। তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই ১০৩ জনের মধ্যে গত নভেম্বরে ৮৯ জনের এমপিও হয়েছে। আর আগে থেকেই এমপিওভূক্ত ছিল ৪২ জন। হিসাব অনুযায়ী, রাজশাহীর আঞ্চলিক পরিচালকের সবমিলিয়ে ১৩১ জন শিক্ষকের এমপিও’র নাম-তালিকা পাঠানোর কথা। কিন্তু চূড়ান্ত এমপিও তালিকায় পাঠিয়েছেন ২০৭ জনের তথ্য। সেই হিসেবে চূড়ান্ত এমপিও তালিকায় অবৈধভাবে অতিরিক্ত ৭৬ জন শিক্ষকের নাম ঢুকিয়েছেন পরিচালক।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাউশির পরিচালক হিসেবে যোগদানের মাত্র ৪ মাসেই আছাদুজ্জামান নিয়ম ভেঙ্গে টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন কলেজের অধ্যক্ষ নিয়োগ, বিভিন্ন বেসরকারি কলেজের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের এমপিও করে দেয়ার বিস্তর অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে অন্য একটি কলেজে উপাধ্যক্ষ পদ থেকে বরখাস্ত থাকা অবস্থায় মাহবুবুর রহমান নামের এক শিক্ষককে বগুড়ার নন্দীগ্রামের মুনসুর আলী ডিগ্রী কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগের ব্যবস্থা করেন পরিচালক অধ্যাপক আছাদুজ্জামান। বিধি অনুযায়ী, অধ্যক্ষ নিয়োগের ক্ষেত্রে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন প্রয়োজন। কিন্তু এই অধ্যক্ষের অনুমোদনের কোনো কাগজপত্র না থাকার পরও তিনি কয়েক লাখ টাকার বিনিময়ে তাকে এমপিওভুক্ত করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে নাটোরের গুরুদাসপুরের রোজী মোজাম্মেল হক ডিগ্রী কলেজে অধ্যক্ষ নিয়োগে মামলা চলমান থাকা ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন না থাকার পরও মো. মাহাতাব উদ্দিন নামের এই অধ্যক্ষের এমপিওভুক্তি করেছেন তিনি। বগুড়ার মহাস্থান মহিসওয়ার ডিগ্রী কলেজে ২০১৭ সালে ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে বাংলা বিভাগে প্রভাষক পদে হেলাল উদ্দিন নামের একজন নিয়োগ পান। কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র অনুযায়ী, ২০১৭ সালে নিয়োগের ক্ষেত্রে অবশ্যই এনটিআরসিএ কর্তৃক সুপারিশকৃত হতে হবে। কিন্তু তা না হওয়া সত্ত্বেও পরিচালক আছাদুজ্জামান তাকে এমপিওভুক্ত করেছেন। রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার মহব্বতপুর খানপুর ডিগ্রী কলেজে হারুন অর রশিদ নামের একজন অর্থনীতি বিভাগে প্রভাষক পদে প্যাটার্ন (জনবল কাঠামো) বহির্ভুতভাবে নিয়োগ পেয়েছেন। অথচ তাকে পরিচালক ও এডি আলমাছ টাকার বিনিময়ে সমন্বয়ের মাধ্যমে এমপিওভুক্ত করেছেন বলে অভিযোগ। চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার রাধানগর বরেন্দ্র কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে প্রভাষক পদে আশরাফুল হক নামের একজন প্যাটার্ন বহির্ভুতভাবে নিয়োগ পেয়েছেন। তাছাড়া এই শিক্ষকের ব্যানবেইসে তথ্য আপডেট না থাকার পরও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে তাকে এমপিওভুক্ত করা হয়েছে। এমনিভাবে নওগাঁর রাণীনগর আবাদপুকুর কলেজের ভূগোল বিভাগে প্রদর্শক পদে মোহা. নাজমুল হককে, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার ড. মোজাহারুল ইসলাম মডেল কলেজে কৃষিবিভাগে মো. আব্দুল লতিবের প্রদর্শক পদে প্যাটার্ন বহির্ভুত নিয়োগ হওয়ার পরও তাদেরকে এমপিওভুক্ত করা হয়েছে। অথচ জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা ২০২১ অনুযায়ী, প্যাটার্ন বহির্ভূত এসব পদে এমপিওভুক্তির সুযোগ নেই।
এছাড়া নাটোরের লালপুর উপজেলার কলশনগর কলেজে স্বপ্না খাতুন (মনোবিজ্ঞান) ও মোহা. রাশেদুল ইসলাম (সাচিবিক বিদ্যা), নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার আজম আলী কলেজে প্রভাষক (হিসাববিজ্ঞান) পদে এবং সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার নাটুয়ারপাড়া ডিগ্রী কলেজের প্রভ